তিনবার বিক্রি হয়ে যাওয়া পারভিনের সৌদি থেকে আকুতি দেশে ফেরার জন্য

‘হাটতেছে হাটতেছে কথা নাই বার্তা নাই হুট কইরা লাথি বসায় দেয়। ডাক্তার দেখানোর কথা কইলে মারে, বেতন বাড়ানোর কথা কইলে মারে, কিছু না করলেও মারে। সারাদিন মাইরের উপর রাখে। মালিক, মালিকের বউ, লগে তাগো ছেলেমেয়েরাও মারে। আর সহ্য হচ্ছেনা। আমারে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করে দেন। নয় গলায় দড়ি দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নাই আমার। আমি বাঁচতে চাই। আমারে বাঁচান।‘

সৌদি আরব থেকে ফোন কলে এভাবে বলতে বলতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন গৃহকর্মী পারভিন আক্তার। খুলনার খালিশপুরের এই নারী পরিবারের সচ্ছলতা ফেরাতে গৃহকর্মীর ভিসায় সৌদি আরব গেছেন। স্বামী অসুস্থ থাকায় কলেজ পড়ুয়া এক মেয়ে সহ পরিবারের দায়িত্ব নিজ কাধে তুলে নেয়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন। কিন্তু ভন্ড দালালের খপ্পড়ে পড়ে সেই স্বপ্নে এখন শুধু চোখের পানি আর দেশে ফেরত আসার আকুতি।

সৌদি আরব থেকে ফোনালাপে তিনি

, ‘আমাকে এখন পর্যন্ত তিনবার বিক্রি করা হয়ছে। দালালের সঙ্গে যে কাজের কথা বলে এখানে আইছি সে কাজ পাইনাই। একসঙ্গে তিন বাসার গৃহকর্মীর কাজ দিছে আর বেতন দিচ্ছে ৫০০ সৌদি রিয়াল (বাংলাদেশি টাকায় ১১ হাজার টাকা)। দুই বছরের বেশি সময় ধরে কাজ করলেও এহন পর্যন্ত এক টাকাও বাড়ায় নাই।‘

তিনি আরো জানান, প্রথমে যে মালিকের কাছে ছিলেন, সে মালিকের কাছে বেতন চাওয়াই তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়া হয়। আর তাঁর পর থেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। চিকিৎসার কথা বললে উল্টো মারধর করে থাকেন। বাইরে পর্যন্ত যেতে দেয় না।

কিভাবে সৌদি আরব গিয়েছেন আর তাঁর প্রতি এমন নির্যাতনের কথা এজেন্সিকে জানিয়েছেন কিনা সে বিষয়ে জিজ্ঞেস করলে পারভিন জানান, ‘গ্রামের কয়েকজন এই ভিসায় সৌদি গেছেন। তাদের থেকে খবর নিয়ে ঢাকায় স্মার্ট কেয়ার কর্পোরেশনে এজেন্সির সাথে যোগাযোগ করি। তারাই সব ব্যবস্থা করে দেয়। তখন নিয়মিত সব খোঁজখবর দিতো। আর এখন এই নির্যাতনের বিষয়টি বারবার এজেন্সিকে জানানো হয়েছে তারপরেও তারা কোনো খবর নেয়নি।

মালিক পরিবর্তনের বিষয়ে জানতে চাইলে পারভীন বলেন, ‘মালিক আমাকে ছাড়তে চায় না। কথা বললেই নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। আমাকে এ পর্যন্ত তিনবার বিক্রি করেছে। দেশে আসার চেষ্টায় বহু টাকা-পয়সা নষ্ট হয়েছে। শরীরে আর দেয়না।‘

রেহেনা পারভীনের মেয়ে সামিয়া আক্তার মালা জানান, সৌদিতে পৌঁছানোর পর থেকে মা প্রচণ্ড কান্নাকাটি করে। সৌদির মালিকরা প্রতিনিয়ত অত্যাচার করে। মা’কে বাথরুমে পর্যন্ত আটকিয়ে রাখে। ঠিকমতো টাকা-পয়সাও দেয় না। দেশে ফেরানোর জন্য ঢাকার বিভিন্ন এজেন্সির দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি। এমনকি প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়েও গেছি। সবাই আশ্বাস দেয়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কাজ হয়নি।

মালার অভিযোগ- বিষয়টি সমাধানের জন্য বহুবার স্মার্ট কেয়ার এজেন্সিতে গেছি। অভিযোগ দিয়েছি। এমনকি ওদের হাতে পায়ে ধরেছি তারপরও সমাধান হচ্ছে না। খুলনা থেকে ঢাকা আসতে আমাদের বহু টাকা খরচ হয়েছে। কিন্তু কোনোদিক দিয়ে কিচ্ছু হচ্ছে না।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চেয়ে স্মার্ট কেয়ার কর্পোরেশনের এক্সিকিউটিভ মাহমুদুল্লাহ আর মাহমুদ কে ফোন করা হলে তিনি খানিকটা এড়িয়ে গিয়ে বলেন অভিযোগের ব্যপারগুলো তিনি দেখেন না। একইসাথে আজ সরকারী ছুটির দিন তাই এই বিষয়ে তিনি কোনো সহযোগিতা করতে পারবেন না বলে ফোন রেখে দেন।

প্রসঙ্গত, বিদেশে নারী গৃহকর্মী দেয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের বিধিমালা থাকলেও কিছু অসাধু ট্রাভেল এজেন্সি সরকারের দেয়া নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ভাড়াটে দালালদের মাধ্যমে নানা রকম মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে হাজার হাজার নারীকে বিদেশে পাঠায়। এর মধ্যে সব থেকে বেশি নারী শ্রমিক পাঠানো হয়েছে সৌদি আরবে।

Comments are closed.